সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাড়াচ্ছে আবাসন শিল্প

“সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাড়াচ্ছে আবাসন শিল্প”
– মো: মাসুদ আলম ( জি.এম, সাফ হোল্ডিংস লি:)

masud general managerবাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ খাত হলো আবাসন খাত। বর্তমানে দেশের হাজারেরও বেশী কোম্পানীর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িত। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এর মতে, বেসরকারীভাবে গড়ে উঠা বিপুল সম্ভাবনাময় এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ২৩ শতাংশ অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশে আবাসন শিল্পের প্রয়োজনীয়তা:
বাংলাদেশে বর্তমানে চলছে চরম আবাসন সংকট। প্রতিবছর বাড়ছে বাড়ী ভাড়া এবং সেই সাথে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে মধ্যবিত্ত, নিন্ম মধ্যবিত্ত এবং নিন্মবিত্তের পথচলা। আবাসন প্রতিষ্ঠানসমূহের সংগঠন রিহ্যাব এর মতে, প্রতি বছর কমপক্ষে ১ লাখ বা তার অধিক পরিমান ফ্ল্র্যাট নির্মাণ করা হলে ক্রমবর্ধমান আবাসন চাহিদার যোগান দেওয়া সম্ভব হবে। শুধুমাত্র ফ্ল্যাট নির্মাণ করলেই হবে না সেই সাথে ফ্ল্যাটের দামও সাধারন মানুষদের আয়ত্বের মধ্যে রাখতে হবে। অন্যদিকে, আবাসন শিল্পের মাধ্যমে সরকারও অনেক লাভবান হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র হতে জানা যায়, প্রতি বছর আবাসন খাত হতে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা সরকারী কোষাগারে রাজস্ব হিসেবে জমা হয় যদিও সরকার এই খাতটিকে কয়েক বছর আগেই অনুৎপাদন খাত হিসেব ঘোষনা দিয়েছে। নানাবিধ প্রতিকূলতার কারনে এই খাত মুখ থুবড়ে পড়ায় রাজস্বের গতিও মন্থর হয়ে যায়, অন্যথায় প্রকৃত রাজস্বের পরিমান ২৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। অন্যদিকে রড, সিমেন্ট এবং অন্যান্য আবাসন সহযোগী খাত থেকে প্রতিবছর রাজস্ব আসে প্রায় ২০০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকার বছরে প্রায় ৪০০০-৫০০০ কোটি টাকা সরকার রাজস্ব পেতে পারে এই খাত থেকে। প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে এই খাতে। জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৯ শতাংশ। কনজুমার এসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর এক জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর এক কোটি চাব্বিশ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে এবং গত ১৫ বছরে রাজধানীতে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩২৫ শতাংশ। সাধারন মানুষের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যায় হয় বাড়ীভাড়ার জন্য। তাই নিজস্ব একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন থাকাটা খুব স্বাভাবিক। সুতরাং, বাংলাদেশে এই শিল্পের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

দেশে নতুন করে গ্যাস, বিদুৎ সংযোগে কড়াকড়ি এবং বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি এই শিল্পকে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ফ্ল্যাট রেজিষ্ট্রেশন ফি বাড়ানো হয়েছে প্রতি বর্গফুটে ২৫০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা যা প্রায় আটগুন। ১০০০-১২০০ বর্গফুটের একটি সাধারন মানের ফ্ল্যাটের রেজিষ্ট্রেশন ব্যয়ই পড়ে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা, এরিয়া ভেদে এর পরিমান আরও বাড়তে পারে। উৎসে আয়কর বৃদ্ধি করায় বিপুল পরিমান অর্থ দিয়ে একটি ফ্ল্যাট রেজিষ্ট্রেশান করতে হয় যা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য একটি বাড়তি বোঝা। বাসস্থান মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম তাই নানাদেশের সরকার এই খাতের উপর বিশেষ গুরত্ব দিয়ে থাকে। আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারতে রেজিষ্ট্রেশন খরচ মাত্র ৬ শতাংশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে এই ফি মাত্র ০১ থেকে ০৪ শতাংশ পর্যন্ত। সেই সাথে ভূমি মালিকদের অতিরিক্ত অফেরতযোগ্য অর্থের দাবীও এই শিল্পকে ঝুকির মুখে নিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে লক্ষ লক্ষ ফ্ল্যাট রেডী হয়ে আছে ক্রেতার অপেক্ষায়। অন্যদিকে বিভিন্ন কোম্পানী ব্যাংক এবং বিভিন্ন অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানে থেকে লোন দিয়ে প্রকল্প তৈরী করে বসে আছেন। বিক্রয় না হওয়ায় ব্যাংকের লোনও শোধ করতে পারছেন না ফলশ্রুতিতে উভয় সংকটে পড়ে গিয়েছেন। সহজ শর্তে হোম লোনের ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতারাও নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ফ্ল্যাট কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। সব মিলিয়ে কঠিন এক সময় পার করছে আবাসন শিল্প এবং সংশ্লিষ্টরা। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ তাদের জীবন জীবিকার জন্য এই খাতের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। সরকারের শক্ত এবং গ্রাহক বান্ধব নীতিমালা না থাকায়, অনেক গ্রাহক ফ্ল্যাট এবং প্লট কিনে প্রতারিত হয়েছেন যার ফলে একটা আস্থার সংকটও তৈরী হয়েছে গ্রাহক এবং আবাসন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। অনেক নাম না জানা কোম্পানী ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকল্পের কোন কাজ না করে হাতিয়ে নিয়েছে গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা যার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই খাতে। তবে সরকারের সাম্প্রতিক সহযোগীতামূলক নীতিমালার কারনে অনেক সমস্যা ইতিমধ্যে কাটিয়ে উঠছে আবাসন শিল্প।

সংকট থেকে উত্তোরণে করনীয়:
একটি নির্ভরযোগ্য শিল্প হিসেবে আবাসন শিল্পকে বিকশিত করার জন্য সেবা সংযোগে, ব্যাংক লোনে, নির্মাণ সামগ্রী সহজলভ্যতা, সহজ শর্তে ভূমি প্রাপ্তি ইত্যাদিতে যে সকল প্রতিবন্ধকতা সমূহ রয়েছে তা দূর করতে হবে।
আবাসন খাতে দেশে উৎপাদিত বিদুৎ এর মাত্র ৬-৭ শতাংশ ব্যবহার হয় তাই এর ব্যবহারের উপর কড়াকড়ি আরোপ করে খুব একটা বেশী বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে বলে বিশেজ্ঞরা মনে করেন না। আশার কথা ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক এবং অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গেল ডিজিট সুদে হোম লোনের সুবিধা দিচ্ছে কিন্তু গ্রাহকদের মনে ধারনা জন্মেছে যে কোন সময় এই ডিজিটে পরিবর্তন আসতে পারে এবং তা বেড়ে যেতে পারে তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্থ করতে হবে যে, আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে এই সুদের হারের কোন পরিবর্তন হবে না, তবেই সাধারন গ্রাহকরা ফ্ল্যাট বা প্লট ক্রয়ে আরো বেশী আগ্রহী হবে। প্রবাসী ক্রেতারা যেহেতু এই শিল্পে বড় একটি অবদান রেখে চলেছে তাই প্রবাসী ক্রেতাদের জন্য অন লাইন সার্ভিস এর ব্যবস্থা করাটাও জরুরী। সরকারীভাবে আরো অধিক পরিমানে ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে হবে এবং উন্নত বিশ্বের মত দীর্ঘ মেয়াদী কিস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ভাড়ার টাকায় ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করা গেলেই স্বপ্নের একটি ফ্ল্যাট সাধারণ নাগরিকের হাতের নাগালে চলে আসবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, বাংলাদেশের আবাসন শিল্পের প্রায় ৮০ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক যা বিকেন্দ্রীকরণ করা অতীব জরুরী। সরকারী-বেসরকারী যৌথ উদ্যোগে জেলা শহর গুলোতে আবাসন শিল্পকে বিকশিত করতে হবে। বর্তমানে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম মূলত এই দুই শহরকে কেন্দ্র করেই আবাসন শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে তবে স্বল্প পরিসরে, কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী শহরে কিছু কিছু আবাসন কোম্পানী কাজ শুরু করেছে। পরিশেষে ব্রিটিশ আইনজীবি স্যার এডওয়ার্ড কোক আবাসন নিয়ে একটি অসাধারন লিখা দিয়ে শেষ করতে চাই-
“প্রত্যেকের কাছেই তার নিজ বাড়ী যেমন একটা বিশ্রামের স্থল ঠিক তেমনি সেটা একটি প্রাসাদ, একটা দূর্গ আর সেই সাথে ক্ষয়, ক্ষতি এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here