থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জানুন এবং সচেতন হোন

থ্যালাসেমিয়া রক্তের একটি রোগ যা সাধারণত বংশ গত ভাবে ছড়ায়। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর রক্তে অক্সিজেন পরিবহন কারী হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতি কম থাকে। থ্যালাসেমিয়া মৃদু এবং তীব্র দুই ধরণের হতে পারে। এক দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে , ভাল ভাবে চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ ও হতে পারে। প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় এক লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়ার বাহক নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতা বা এনিমিয়া রোগে ভুগে থাকেন। মৃদু থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় চিকিৎসার তেমন প্রয়োজন হয়না। অপর দিকে তীব্র থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগীকে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়।

কি কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশ গত রোগ। সাদারণত ত্রূটি গত হিমোগ্লোবিন ও জিনগত কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়। মা এবং বাবা উভয় ই অথবা যেকোন একজনের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে এটি সন্তানের মধ্যে ছড়াতে পারে। মা এবং বাবা উভয়ের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া বাহক থাকলে সেক্ষেত্রে শিশুর থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২৫ ভাগ।

থ্যালাসেমিয়ার প্রকারভেদ-

থ্যালাসেমিয়া প্রধানত দুই ধরণের হয়ে থাকে
যথাঃ

  • আলফা থ্যালাসেমিয়া
  • বিটা থ্যালাসেমিয়া

আলফা থ্যালাসেমিয়া
চারটি জীন দ্বারা আলফা থ্যালাসেমিয়া গঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে মা এবং বাবা প্রত্যেকের কাছ থেকে দুটি করে এ জীন পাওয়া যায়। এর মধ্যে এক বা একাধিক জীন ত্রূটি পূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। সমস্যা টি কত টা মারাত্মক তা নির্ভর করে চার টির মধ্যে কত টি জীন ত্রুটি পূর্ণ তার উপর। যেমন – একটি জীন ত্রূটি পূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষন বা উপসর্গ দেখা যাবেনা তবে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এ রোগ ছড়াতে পারে। দুটি জীন ত্রূটি পূর্ণ হলে মৃদু উপসর্গ দেখা যাবে। এ অবস্থার আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনোর নামে পরিচিত। তিনটি জীন ত্রূটি পূর্ণ হলে মাঝারি থেকে মারাত্মক ধরণের এর উপসর্গ দেখা যাবে। এ অবস্থায় হিমোগ্লোবিন এইচ ডি জিজ নামে পরিচিত। চার টি জীন ত্রূটি পূর্ণ হলে মারাত্মক ধরণের উপসর্গ দেখা যাবে। এ অবস্থাকে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর অথবা হাইড্রবস ফিটেইলস নামে পরিচিত এর ফলে প্রসবের পূর্বে ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া
বিটা থ্যালাসেমিয়া ধারা দুটি জিন দ্বারা গঠিত হয়। মা এবং বাবা প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে মোট দুটি জিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি অথবা দুটি জিন ত্রূটি পূর্ণ হলে বিটা থ্যালাসেমিয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কত টা মারাত্মক তা নির্ভর করে চার টির মধ্যে কতটি জিন ত্রুটি পুর্ন তার উপর। যেমন – একটি জিন ত্রূটি পূর্ণ হলে মৃদু উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থা বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর নামে পরিচিত। অপর দিকে দুটি জিন ই ত্রূটি পুর্ন হলে মাঝারি থেকে মারাত্মক উপসর্গ দেখা যাবে। এ অবস্থা বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর অথবা কুলিস এ্যানিমিয়া নামে পরিচিত। যেসব নবজাতক শিশু এই সমস্যা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকলেও জন্ম পরবর্তী দুই বছর সময়ে মধ্যেই এই রোগের উপসর্গ দেখা যায়।

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষন
থ্যালাসেমিয়া রোগের ধরণ এবং এর তীব্রতাত্র উপর ভিত্তি করে এর উপসর্গ গুলোও ভিন্ন হতে পারে। তবে থ্যালাসেমিয়া হলে সাধারণত কিছু লক্ষন দেখে অনুমান করা যায়। যেমন – অবসাদ বা অস্বস্তি অনুভব , শারীরিক দূর্বলতা , শ্বাস কষ্ট , মুখ মন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া , মুখের হাড়ের বিকৃতি , শারীরিক বৃদ্ধির ভার কমে যাওয়া , পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা পেট ফুলে যাওয়া , গাঢ় রঙের প্রস্রাব , অতিরিক্ত আয়রন , সংক্রমণ , অস্বাভাবিক অস্থি , প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া , হৃদপিন্ড এ সমস্যা , ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া বা জিন্ডিস ইত্যাদি লক্ষণ বা উপসর্গ গুলো দেখা যায়।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে লোহিত রক্ত কণিকার মাত্রা , লোহিত রক্ত কণিকার আকারের পরিবর্তন , বিবর্ণ লোহিত রক্ত কণিকা , লোহিত রক্ত কণিকায় হিমোগ্লোবিনের অসম থাকা , শিশুর রক্তে আয়রণ ও লৌহের পরিমাণ , হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ইত্যাদি জানা যায়। ডি এন এ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা অথবা রোগী ত্রটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিন বহন করছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। গর্ভস্থ সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোরিওনিক ভিলিয়াস স্যাম্পলিং , এ্যামনিওসেনটিসিস , ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং ইত্যাদি পরীক্ষা করা যেতে পারে। থ্যালাসেমিয়া আছে বা হতে পারে এরুপ সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্র্যোজনীয় পরীক্ষা করতে হবে।

কাদের থ্যালাসেমিয়া হতে পারে?
মা এবং বাবা যেকোন একজনের অথবা মা বাবা উভয়েরি থ্যালাসেমিয়া থাকলে তাদের সন্তানের মধ্যে ও এই রোগ দেখা দিতে পারে। আবার কিছু কিছু অঞ্চলে এ রোগ বেশি দেখা যায়। যেমন – দক্ষিণ এশিয়া , দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়া , আফ্রিকা , মধ্য প্রাচ্য , ইতালি , গ্রীস ইত্যাদি।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা
মাইনর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসা কোন প্রয়োজন হয় না। অপর দিকে মেজর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে , নিয়মিত রক্ত গ্রহণ ( প্রয়োজন বোধে বছরে ৮ থেকে ১০ বার ) করতে হয়। বার বার রক্ত নেওয়ার ফলে বিভিন্ন অঙ্গে অতিরিক্ত লৌহ জমে যেতে পারে এবং এর ফলে যকৃত বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই , এরকম ক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে আয়রন চিলেশন থেরাপীর সাহায্যে অতিরিক্ত লৌহ বের করে দেওয়া হয়।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে একজন ম্যাচ ডোনার লাগবে। আমাদের দেশে অস্থমজ্জা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা না থায় দেশের বাইরে গিয়ে এ চিকিৎসা করতে হবে।

এছাড়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন ও ফলিক এসিড সেবন করতে হবে। আবার জীবন যাপন পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তিন ও আনতে হবে।

যেমন- চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোন ভিটামিন বা ঔষধ সেবন না করা। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে ভিটামিন ডি , ক্যালসিয়াম , জিংক সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয় 

  • পরিবারের কারো থ্যালাসেমিয়া রোগের ইতিহাস থাকলে , সন্তান গ্রহণেরপূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • বিবাহের সময় পাত্র এবং পাত্রীর রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে , তাদের মধ্যে কেউ থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কিনা। আবার নিকট আত্মীয় দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই , এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া পরবর্তী জটিলতা 
লাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের বার বার রক্ত পরিবর্তনের ফলে রক্তবাহিত বিভিন্ন রোগ বিশেষ করে হেপাটাইসিসের সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং তা হৃদপিন্ড , যকৃত এবং এন্ডোক্রাইন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অস্থিমজ্জা প্রসারিত হয়ে হাড় পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। ফলে মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার থ্যালাসেমিয়ার আক্রান্ত রোগীর প্লীহা বড় হয়ে যায়।

শিশুর থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়
লাসেমিয়া মেজর অর্থাৎ যে শিশু বাবা এবং মা উভয়ের কাছ থেকেই স মস্যা গ্রস্থ জিন জন্ম গত ভাবে পেয়েছে , জন্মের পর পর ই শিশু টিকে ফ্যাকাসে দেখা যাবে। শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক ভাবে হবেনা। অর্থাৎ তার হাঁটা , বসা , দাঁড়ানো সব কিছুই অন্য বাচ্চা থেকে  ভিন্ন হবে । ১০ বছরের একটা স্বাভাবিক বাচ্চার তুলনাইয় একটি অসুস্থ বাচ্চাকে ৫ বছরের মত লাগবে।

শিশু টির রক্ত স্বল্পতা , ক্ষুধা মন্দা সব বিষয়ে অনাগ্রহ  দেখা দিতে পারে আবার দু চোখের দূরুত্ব ও বেড়ে যেতে পারে। নাকের গোড়া প্রসারিত হয়ে যেতে পারে , কপালের সামনের হাড় ফুলে উঠতে পারে। দাঁত ফাক হয়ে যেতে পারে। পেট ফুলে উঠতে পারে , হাত পা ও চোখ হলুদ হয়ে যেতে পারে ইত্যাদি অর্থাৎ শিশু টিকে স্বাভাবিক মনে হবেনা। আবার পরীক্ষা করলে তার প্লীহা দেখা যাবে।

এই প্লিহা প্রথমে বড় হয় এর পর ধীরে ধীরে লিভার বড় হয়। এই অঙ্গ গুলো বড় হলে তখন খুব ঘন ঘন রক্ত দিতে হয়। নিয়মিত রক্ত না দিলে শিশুটি স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করতে পারেনা।

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা কত টা জরুরী
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের পূর্বে সতর্কতা স্বরুপ বিয়ের আগে পাত্র এবং পাত্রীর রক্তের হিমোগ্লোবিনের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। স্বামী এবং স্ত্রী দুজনেই এ রোগের বাহক হলে সন্তানের এ রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সাধারণত থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবে এরুপ কোন সম্ভাবনা আছে এমন কোন পুরুষ বা মহিলার সাথে অন্য কোন থ্যালাসেমিয়া রোগী বা রোগের সম্ভাবনা আছে এমন কারো সাথে বিয়ে হলে তাদের সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সুতরাং বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিলে সেটি সন্তানের ভবিষতের জন্য বেশি মঙ্গল জনক হবে।

থ্যালাসেমিয়া একটি জিন গত রোগ। এই রোগে রক্তের লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙ্গে যায় এবং রোগী রক্ত স্বল্পতায় ভুগতে থাকে । রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তান দের মধ্যে এ রোগের সম্ভাবনা বেশি দেখা যেতে পারে।

বার বার রক্ত দিয়ে ও কোন রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করা যায়না। প্রথম প্রথম তিন মাস পর পর এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হলে ও পরে দুমাস পর পর রক্তের প্রয়োজন হয়। আবার বয়স্ক থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে অনেকের মাসে একাধিক বার রক্ত দেবার প্রয়োজন হয়। এ রোগের চিকিৎসা অতন্ত ব্যায় বহুল হওয়ার কারণে দরিদ্র মানুষের জন্য রোগাক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসার খরচ বহন করা অসম্ভব হয়ে যাইয়। তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতার কোন বিকল্প নাই। তাই , বিয়ের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা এবং নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে পরিত্যাগের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করতে হবে।

সবশেষে
যেহেতু থ্যালাসেমিয়ার তেমন চিকিৎসা আমাদের দেশে নেই , তাই এ রোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা ও পরীক্ষা করে দেখা উচিত। শিশু গর্ভে আসার চার মাস পর থেকে থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা নির্ণয় করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৭০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এবং সারা পৃথিবীতে প্রায় এক বিলিয়ন থ্যালাসেমিয়া রোগী আছে । প্রতি বছর আরো প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। এ জন্য বলআ হয়ে থাকে যে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে প্রচুর সচেতনতার প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here