আমরা একটিবার মৌলিক মানুষ হই

where is the humanity

খাবারের অভাবে কণিকা আত্নহত্যা করলো, কিংবা অন্যভাবে যদি বলি পূঁজিবাদ খুন করলো অল্প বয়সের একটা প্রাণকে।
এদেশে কণিকাদের আদৌ সংখ্যা কম কি? সে আত্নহত্যা করেছে। আর অনেকেই আছেন যারা আধপেটা খেয়ে, ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে কুকুর বিড়ালের মত বেঁচে আছেন (অসম্মান করে বলিনি, জীবনের দূর্দশাটুকু তুলে ধরতেই এই উদাহরণ)।

এই আত্নহত্যায় অনেকের বিবেকে আঘাত লেগেছে। সত্যিকার অর্থেই সকলের খারাপ লাগছে। এখানে কোন ভাণ নেই, লোকদেখানো ব্যাপার নেই। আমরা সাধারণ মানুষেরা লাঞ্চ ডিনার করে, কিংবা চা কফি খেতে খেতে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে অনুভূতিটুকু ফেইসবুকে প্রকাশ করছি। এর প্রতি আমার সর্বোচ্চ সম্মান আছে। তারপরেও একটা কিন্তুর কথা থাকে। যেমন আমি শুধু আমার কথা বলছি, আমিই বা কি করতে পারি, শুধুমাত্র অনুভব ছাড়া? আমিও টাকার অভাবে না খেয়ে, কিংবা একটা শিঙাড়া খেয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল পার করি, তাই আমার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। দোষ দেই সরকারের। কিন্তু এই দোষও দিতে পারিনা। কারণ ক্ষমতাবানদের আলাদা শ্রেণী, আলাদা ব্যাপারস্যাপার। দূর্দশাগ্রস্তদের নিয়ে ভাবার টাইম তাদের কই? তাছাড়া বেশীরভাগ শাসকগোষ্ঠী বুর্জোয়া। তাদের কাছ থেকে মানবিকতা আশা করা যায়না। তাই নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, সুবিধাবঞ্চিতদেরকেই একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে।

অথচ তাও সম্ভব না। পূঁজিবাদ আমাকে, আপনাকে সকলকেই গিলে খেয়েছে।

প্রথমত, রেস্টরুরেন্টে খাওয়া, খাবারের লোভনীয় ছবি আপলোড করে অন্যদেরকে প্রভাবিত করা এখন হালফ্যাশান। এতে অসুবিধে নেই। আমাদের জীবনকে উপভোগের সর্বোচ্চ অধিকার আমরা রাখি। স্টুডেন্ট প্লেট ১৮০টাকা মাত্র। তারমানে একজন স্টুডেন্টের জন্যে ১৮০টাকা খুব একটা বেশী কিছু নয়! আর এভাবেই আমরা নিজেরা নিজেদের জীবনকে উপভোগ করতে করতে ভুলে যাচ্ছি অনেককিছু, পূজিবাদ গিলে ফেলছে আমাদের। সামান্য খাওয়াদাওয়া হতেই পারে, কিন্তু তারসাথে এসে পড়লো পূজিবাদের আরও কড়া ডোজ, ডে সেলিব্রেশন, ডিফারেন্ট প্যাকেজ, বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি, বুফে ব্লা ব্লা ব্লা। এসবের বিল সম্ভবত হাজারের উপরে। বিভিন্নরকম খাবারের ডেকোরেশনের উপর অহেতুক কত টাকা আমরা খরচা করছি। এরমধ্যে আছে রেস্টুরেন্টের ব্র‍্যান্ড, যেখানে ১৫টাকার মিনারেল ওয়াটার হয়ে যায় ৪০, ৫০, ১০০ টাকা। আর বিনিময়ে পেয়ে যাই সামাজিক অবস্থান, আপলোডের সুন্দর ছবি। এরপর আসলো আরও পাওয়ারফুল ডোজ, এ এক এলাহি কারবার। ফুড ফ্যাস্টিভাল। খাবারের স্টল, কনসার্ট, আরও গ্রেট গ্রেট আইডিয়া। পূজিবাদের এই লেয়ার, পূজিবাদকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে ।

অথচ ফুড ফ্যাস্টিভাল বলতেই অন্যরকম লাগে। বছরের অন্তত এই একটা রেস্টুরেন্ট মালিকগুলো কি উদারতা দেখাতে পারতোনা? এই একটা দিন কি অন্তত না খেতে পাওয়া লোকেদের জন্যে আয়োজন করতে পারতোনা ?

রেস্টুরেন্ট নিয়ে আমার কথাগুলো স্ববিরোধীতা অনেকাংশে। কারণ আমিও যে যাইনা তা না। তবে আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকলে বলবো, এই পর্যন্ত রেস্টুরেন্টে যত খেয়েছি সবসময় সেই রেস্টুরেন্টের সবচেয়ে কমদামী খাবারটা খেয়েছি। তাছাড়া পরিমাণে কম খাই বলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সঙ্গে থাকাদের সাথে ডিশ শেয়ার করে খাই এবং কোথাও গিয়ে যদি দেখি ব্র‍্যান্ডের কারণেই বাড়তি টাকা নিচ্ছে তাহলে সেখানে দ্বিতীয়বার পা রাখিনি ।
মানুষ না খেতে পেয়ে মরে , আর সেখানে এতো বিলাসিতা মানায় না, আমি সেটা মন থেকে বিশ্বাস করি এবং বিলাসিতা করার সময় নিজের কাছে নিজে ছোট হই।

দ্বিতীয়ত, আজকাল ফ্যাশন জামাকাপড়, সাজসজ্জা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে আমরা অন্ধের মত আচরণ করি। টিভি চ্যানেলে চলে রূপচর্চা বিষয়ক নানা প্রোগ্রাম। সেসব দেখতে বসলে তারা যেভাবে বলে সেভাবে মনেহয় “রূপচর্চা নিয়মিত করতেই হবে, ভাত না খেয়ে হলেও করতে হবে।” ফর্সা হওয়ার দামি দামি ক্রিম। দাম শুনে আমার মাথা ঘোরায় । অথচ এসব টাকা দিয়ে কিনে অনেকে প্রতারিত হচ্ছে। কে বলেছে একটা মেয়েকে ফর্সা হতেই হবে? সৌন্দর্য মানেই ফর্সা হওয়া। লেখাপড়া করে আমরা কেনো পুরোনো সেই সামাজিক কু-ধারণার দিকে হাঁটবো? এক্ষেত্রে খুব ঠোঁটকাটার মত আমার বলতে ইচ্ছে করে, আপনি পড়াশুনা করেও যদি এই ধারণা থেকে বের না হতে পারেন, তবে দয়াকরে সার্টিফিকেটগুলো পুড়িয়ে ফেলুন। আপনার তো আত্নমর্যাদাবোধই অর্জন করতে পারেননি, সার্টিফিকেট রেখে কি হবে?

পার্লারে আমরা কতকত টাকা খরচ করে ফেলি। একজন মানুষকে অন্য একজন মানুষ হাত, পা, চুল, সারা শরীর পরিষ্কার করে দিচ্ছে, ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। এই কালচার অন্যজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জায়গাটা পর্যন্ত নষ্ট করে দিচ্ছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। টাকা পয়সা খরচের কথা আর নাইবা বললাম। অথচ আমরা জানিওনা কতকত মানুষ তাদের বাবাকে-মাকে চিরকালের জন্যে হারিয়ে ফেলছে শুধুমাত্র চিকিৎসার টাকার অভাবে। বিশেষ করে মেয়েরা যখন রূপকে ধরে রাখাটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং সেটা নিয়েই নিজের চিন্তা চেতনা সময় বেশি ব্যয় করে তখন মেয়ে হিসেবে নিজেদের মানসিকতার জন্যে নিজেই নিজের কাছে ছোট হয়ে পড়ি।

নিজেকে কিম্ভুতকিমাকার করে সাজিয়ে তোলায় নিজের মৌলিকত্ব হারানোর ব্যাপারটা আমাদের মাথা থেকে চলে গিয়েছে পূঁজিবাদের কারণে । টিভি , সিরিয়াল , অনুষ্ঠান , মিডিয়া বিভিন্নকিছুর মাধ্যমে আমরা প্রভাবিত হই এতোবেশী যে, ভাবিওনা কি করছি, কেনো করছি, কি পাচ্ছি। অন্যজনকে দেখেই সব ভুলে গিয়ে সেটা করে বসি।

জামাকাপড়ের কথা যদি বলি আমি সত্যিকারভাবে চাই মানুষ হতে, মৌলিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ। সমাজের বিভিন্ন অসংগতি বিষয়ে আলোচনার সময় আমাদের শ্রদ্ধেয় স্যার বলেছিলেন “আগে নিজেকে ভোগবাদীতা থেকে বের করতে হবে। আপনি দেখবেন আমি জামাকাপড় নিয়ে অতোটা ভাবিনা।সেসবের জন্যে ওভাবে অর্থ খরচ করিনা।”
সেই কথাটা আমি কোনদিন ভুলবোনা এবং সেদিনের শিক্ষাটা আমার চোখ খুকে দিয়েছিলো। তাই জামাকাপড় নিয়ে যদি লোভী হয়ে উঠি স্যারের সেই কথা মনে পড়ে নিজের ব্যক্তিত্ব হারায়, নিজেকে ভন্ড মনেহয়। ফলে অনেকক্ষেত্রে নিজের লোভকে সামলেছি। কিন্তু আরও বেশি সামলানো উচিত।

তৃতীয়ত, আজকাল ঘরকে নান্দনিকভাবে সাজানোর তীব্র প্রতিযোগিতা। উদাহরণ, ঘরে অ্যাকুরিয়াম থাকে, সেখানে কত সুন্দর মাছ। একটা অ্যাকুরিয়াম মেইনটেইন করতেও অনেকটাকা। অথচ সে টাকায় গরীবের ঘরের দু চারদিনের খাবার হতো, কিংবা কারও খাতাকলম পেন্সিলের টাকা হতো। মাছেদের চেয়ে একজন মানুষ অনেকবেশী গুরুত্বপূর্ণ নয় কি? বছর বছর ফার্ণিচার পাল্টাই, হাজার, দু হাজার, এমন কতশত দামী দামী জিনিসে আমরা আমাদের ঘর সাজাই। এরকম অনেকভাবেই আমরা টাকা খরচ করি, যা হয়তো অন্যভাবে করলে মানবিকতা রক্ষা হতো। তাছাড়া এমন এমন সুন্দর সুন্দর ঘর ঘুরে এসে আমার মত মধ্যবিত্তরা লোভী হয়ে উঠে। সেই চাকচিক্য মরিচীকার মত আমাদের টেনে নিয়ে যায়। মনেহয় অমন সৌখিন জীবন না হলে, জীবনই অর্থহীন।

চতুর্থত, বর্তমান জীবনটা প্রদর্শনের উপর নির্ভর করে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমরা খুব বেশি পরিমাণ জীবন প্রদর্শনমুখী হয়ে পড়েছি। যার যত শো অফ, সে তত প্রোফাইলধারী। ফেইসবুক প্রোফাইল আজকাল আপডেট সবকিছু ব্যবহার , গ্রহণের উপর নির্ভরশীল। বাজারে যা এসেছে তা সবার আগে কিনে প্রচার করলে প্রোফাইল হাই হয়। অনেকেই আজকাল গল্প করার জন্যে, আপলোড দেওয়ার জন্যেও অনেককিছু করে। পাশাপাশি অন্যজন প্রভাবিত হয় এবং যেকোনভাবে সেটা অর্জনের জন্যে চেষ্টা করে। আর যারা পারেনা তারা অনেকক্ষেত্রে কিছুটা হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে।

আর এই ব্যাপারগুলো আমাদের নিজেদের জন্যেও ভয়ংকর। আমাদের হাহুতাশ বাড়াচ্ছে, বাড়াচ্ছে পরিবারের উপার্জনশীল ব্যক্তিটির উপর মারাত্বক চাপ। স্কুল, কলেজে পড়ুয়া বাচ্চাদের রেস্টুরেন্ট বিল, হ্যাং আউট পার্টি, ইন্টারনেট ব্রাউজিং বিল দিতে গিয়ে হাজার হাজার বাবা মার অতিরিক্ত টেনশনে প্রেশার ডায়াবেটিস ধরা পড়ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই তাদের। যুগের সাথে তাল মেলাতে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বাস্তবিক চিত্র এটা। সংকট তৈরী হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা খুববেশী আত্নকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি।

হয়তো বলতে পারেন এসবের সাথে কর্মসংস্থান জড়িত, অর্থনৈতিক উন্নয়ন জড়িত, কিংবা নিজের টাকা নিজের যেমনখুশি তেমনিভাবে ব্যবহার করার অধিকার আছে। সবগুলো সত্য। কিন্তু কিছুই অমন লাগামহীন হওয়া উচিত না, অন্তত বাংলাদেশের মত হতদরিদ্র দেশে।

আমরা করবোনা তা নয়। ছোট্ট জীবন। বিনোদন বিহীন হতে দেওয়া যায়না। কিন্তু লাগামহীন ভাবে নয়। সংজ্ঞাহীনভাবে নয়।

পূঁজিবাদের সুচতুর ফাঁদ বিভিন্নভাবে উপরের বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অথচ একটা সুন্দর, সহজ জীবনযাপনে এসবের চেয়েও সৃষ্টিশীল অন্য অনেককিছু গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন নিজেদেরকে পূঁজিবাদের এই ফাঁদ থেকে একটু একটু করে বের করতে পারবো, দেখবো ভালো আছি আমি, ভালো থাকবে আমার আশেপাশের লোক। অনুসরণ, অনুকরণ বাদ দিয়ে আমরা মৌলিক মানুষ হই। দিনশেষে রাতে একবার আয়নায় সামনে নিজের আপাদমস্তকে একবার চোখ বুলিয়ে ঘুমাতে যাই।

লেখক: আসমা সাদাত চৌধুরী, সমাজকর্মী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here